Loading...
You are here:  Home  >  মধ্যপ্রাচ্য  >  Current Article

সিসি মার্কা নির্বাচন: গণতন্ত্রের উল্টো স্রোত

Abul Fattah CC

মো. ছানাউল্লাহ:
২ এপ্রিল প্রকাশিত এ নির্বাচনের ফলাফলে আপাতদৃষ্টিতে দ্বিতীয়বারের মতো ৯৭ শতাংশ ভোট পেয়ে তিনি জয় ছিনিয়ে আনেন। যদিও তথাকথিত গণতন্ত্রের তকমা সাঁটানো এ নির্বাচনে ভোট পড়েছে মাত্র ৪১ শতাংশ। দেশটির মোট জনসংখ্যা ৮ কোটি ৪০ লাখ। এর মধ্যে ভোটারের সংখ্যা ২ কোটি ৪০ লাখ। এবারের নির্বাচনে ১৬ লাখ ৮০ হাজার ভোটার ব্যালট নষ্ট করেছেন। যাঁরা ব্যালট নষ্ট করেছেন, তাঁরা রাজনৈতিকভাবে অসচেতন, নাকি স্বৈরশাসকের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর জন্য ইচ্ছা করেই এসব ব্যালট নষ্ট করেছেন, তা বলা দুষ্কর। নষ্ট হওয়া এ ভোটের পরিমাণও কম নয়, মোট ভোটের ৭ শতাংশ। বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, এর আগের নির্বাচনেও তিনি ৯৭ শতাংশ ভোটই পেয়েছিলেন। তবে তার পরিমাণ ছিল এবারের চেয়ে ৬ শতাংশ বেশি।
লোক–দেখানো এ নির্বাচনে শক্ত কোনো ব্যক্তি সিসির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাননি। একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মুসা মোস্তফা মুসা। যিনি নিজেও আগে প্রেসিডেন্ট সিসির সমর্থক ছিলেন। বর্তমানেও প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন বলেই বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। মধ্যমপন্থী তকমাধারী এই ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে খুব একটা পরিচিতও নন। মুসার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার একটা স্পষ্ট কারণ রয়েছে। বর্তমান বিশ্বে কথিত গণতান্ত্রিক দেশগুলোয় ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ বলে একটা শব্দ শোনা যাচ্ছে। মুসাও ঠিক তাই। তিনি প্রধান বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। অথচ নির্বাচনে সম্ভাব্য সব প্রার্থীকে হুমকি দিয়ে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। এ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সাতজন প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু পরে তাঁদের অধিকাংশই নিজেদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। এদের মধ্যে মানবাধিকার আইনজীবী খালিদ আলি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমেদ শফিকও রয়েছেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করার পর দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান সামি আনানকে আটক করা হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁকেই সিসির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু তাঁকেও আটক করা হয়। ফলে অন্য বিরোধীদলীয় রাজনীতিকেরা এ নির্বাচন বয়কট করেন।
২০১৩ সালে সিসি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত মিসরের প্রথম প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসিকে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাত করেন। পরের বছর এই সেনাপ্রধান প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম দফায় ক্ষমতায় আসেন। ক্ষমতায় এসেই তিনি জামাল আবদে নাসেরের মতো অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী মিসর গঠনের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। এ জন্য তিনি চরমপন্থা বেঁচে নেন। বিভিন্ন অভিযোগ এনে মুরসির হাজার হাজার সমর্থককে জেলে ঢোকান। এর মধ্যে অনেককেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
লন্ডনভিত্তিক ম্যাগাজিন ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন বলছে, মিসরকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে সিসি বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমিয়ে এর ওপর কর আরোপ করেন। অর্থের জোগান বাড়াতে ২০১৬ সালে মুদ্রার বিনিময় মূল্যও হ্রাস করেন। বর্তমানে দেশটির বৈদেশিক সঞ্চয়ের পরিমাণ হোসনি মোবারকের সময়কার চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। মুরসিকে উৎখাত করে সিসি যখন ক্ষমতা দখল করেন, তখন দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়ের পরিমাণ ছিল ৪৬ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮১ বিলিয়ন ডলারে। গত বছর দেশটির বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ ৩০ শতাংশ থেকে কমে এসেছে। ফেব্রুয়ারিতে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল সুদের পরিমাণও হ্রাস করেছে। সিসি পর্যটন খাতের দিকে বিশেষ নজর দিয়েছেন। যার ফলে দেশটিতে পর্যটকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৭ সালে মিসরে প্রায় ৮৩ লাখ পর্যটক আসে। ২০১৫ সালে এর পরিমাণ ছিল ৫৪ লাখ।

বর্তমানে বিভিন্ন দেশের শাসকদের মধ্যে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সেটা শুধু সিসির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই কাতারে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সবার চেয়ে এগিয়ে। একই কাতারে আছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত সিরিয়ার আসাদ সরকারকেও ভিন্ন অর্থে এ কাতারে আনা যায়। নাগরিকদের প্রতি অসহিষ্ণু আচরণে জন্য ইতিমধ্যেই খ্যাতি পেয়েছেন ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে। রোহিঙ্গাদের দেশছাড়া করার জন্য একই কাতারে যাচ্ছেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি। দুতার্তে ও সু চি তাঁদের ক্ষমতা পালাবদলের মেয়াদের দিক থেকে এখনো এই কাতারে না এলেও সমীকরণ বলছে এভাবেই শাসকেরা ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখেন। কখনো সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করে সংখ্যাগরিষ্ঠদের বাহবা নিয়ে, কখনো চরম প্রশাসনিক নিপীড়ন চালিয়ে কখনোবা বৈদেশিক রাষ্ট্রগুলোর প্রচ্ছন্ন সমর্থন নিয়ে। সম্প্রতি জার্মানভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বেরটেলসমান স্টিফটুং এক প্রতিবেদনে একনায়কতান্ত্রিক দেশের একটা দীর্ঘ তালিকা দেয়। তাতে বর্তমান বিশ্বে গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা ৭১ এবং একনায়কতান্ত্রিক শাসনাধীন দেশের সংখ্যা ৫৮ বলে চিহ্নিত করা হয়। শেষের কাতারে বাংলাদেশকেও রাখা হয়েছে। একনায়কতান্ত্রিক শাসনাধীন দেশের সংখ্যা বাড়তির দিকে লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুসারে ২০১৬ সালে এ সংখ্যা ছিল ৫৫। অন্যদিকে, কমেছে গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৭৪।
প্রখ্যাত আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল ফিলিপস হান্টিংটন তাঁর ‘দ্য থার্ড ওয়েভ: ডেমোক্রেটাইজেশন ইন দ্য লেট টোয়েন্টিথ সেঞ্চুরি’ বইয়ে আধুনিক বিশ্বে গণতন্ত্রের তিনটি জোয়ারের কথা বলেছেন। প্রথম জোয়ারটি ছিল ১৮২৮ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত। শত বছরের এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ বিশ্বের ২৯টি দেশ গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করে। এরপর ১৯২০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ২০ বছর গণতন্ত্রের ভাটার সময় গেছে। তখন কোথাও ফ্যাসিজমের আবার কোথাও কমিউনিজমের বিকাশ হয়েছে। গণতন্ত্রের দ্বিতীয় জোয়ার শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যৌথ বাহিনীর বিজয়ের পর। তখন বিশ্বে গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৬। ১৯৫৮ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত আবার ভাটা আসে। এ সময় সাবেক ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে কর্তৃত্ববাদী শাসন জোরদার হয়ে ওঠে। হান্টিংটনের মতে গণতন্ত্রের শেষ জোয়ারটি ছিল ১৯৭৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত, এ সময়ে দক্ষিণ ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া ও বিভিন্ন কমিউনিস্ট দেশে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটে। ১৯৯৪ সাল নাগাদ বিশ্বে গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭২।
হান্টিংটন আজ বেঁচে নেই। থাকলে হয়তো তিনি গণতন্ত্রের আরও আরও ঢেউ নিয়ে লিখতেন। গবেষণা করতেন। তবে তিনি ১৯৯১ সালে যখন তাঁর এ গবেষণাটি শেষ করেন তখন তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, শিগগির আরেকটি ভাটার টান আসবে। সেই আশঙ্কা তাঁর গবেষণারই অংশ। কারণ, তিনি প্রতিটি জোয়ারের শেষে ভাটার টান দেখিয়েছেন। সম্ভবত বর্তমান বিশ্বে গণতন্ত্রের সেই ভাটার টানটাই দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
হান্টিংটন গণতান্ত্রিক দেশ নির্বাচনের ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের প্রথম শর্ত নির্বাচনকেই মানদণ্ড হিসেবে নিয়েছিলেন। তবে এটি কোনোভাবেই গণতন্ত্রের একমাত্র নির্ণায়ক নয়। এর সঙ্গে নির্বাচনের ধরন, প্রকরণ, দল ও ভোটারদের অংশ গ্রহণের সুযোগসহ নানাবিধ মৌলিক প্রশ্ন ও শর্ত জড়িত। কেবল সিসি মার্কা নির্বাচন হলেই তাকে গণতান্ত্রিক নির্বাচন বলা যাবে না। ভোটার মোবিলাইজেশনের ধরন কেমন হবে, তারও একটি দিকনির্দেশনা রয়েছে সঠিক গণতন্ত্র নির্ণয়ের ক্ষেত্রে। যেসব ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছেন, তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ততা কেমন। তাঁদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পেছনে কোনো ধরনের বল প্রয়োগ বা অবৈধ লেনদেন হচ্ছে কি না, তাও ধর্তব্য বিষয়। অন্যদিকে যাঁরা ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছেন না, তার নেপথ্যের কারণটিও জানা আবশ্যক।
গণতন্ত্রের এই নিম্নমুখী অবস্থান আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতেও লক্ষ করা যাচ্ছে। মালদ্বীপে ইয়ামিন সরকার বিচার বিভাগের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ক্ষমতা স্থায়ী করতে তৎপর। অন্যদিকে, দ্রুত শান্তি ও উন্নতিতে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণকারী মালয়েশিয়ায়ও অশনিসংকেত দেখা দিচ্ছে। দেশটির দীর্ঘ ২২ বছরের প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ আবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক নড়েচড়ে বসেছেন। মেয়াদ শেষ হওয়ার দুই মাস আগে গত শুক্রবার (৬ এপ্রিল) সাংসদ ভেঙে দিয়েছেন তিনি। এর আগে ৫ এপ্রিল কৌশলে মাহাথিরের নতুন দল বারসাতুরের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। অজুহাত তাঁর দল নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র দাখিল করতে পারেনি। মাহাথিরের হাতে এই এপ্রিল মাসই সময় রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে চাহিদানুযায়ী কাগজপত্র দাখিল করে আপিল করতে পারবে বারাসাতুর। নাহলে তা স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ হবে। মূলত, শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীবিহীন নির্বাচনে যেতেই রাজাক সরকার এসব অজুহাতের পথ তৈরি করছে। হয়তো তিনিও ভিন্ন অর্থে সিসির পথে হাঁটবেন।

    Print       Email

You might also like...

F5062038-0877-4F7E-BC18-346010771B82

জেদ্দা কনস্যুলেটে প্রবাসীদের ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়

Read More →