Loading...
You are here:  Home  >  কলাম  >  Current Article

সীমিত স্বাধীনতা আর সীমাবদ্ধ গণতন্ত্র

হাসান হামিদ

অসহিষ্ণুতা, সহিংসতা আর বর্বরতার কথা এলে আমরা প্রায় সময়ই ‘মধ্যযুগ’কে টেনে আনি। মধ্যযুগীয় বর্বরতা বা অস্বাভাবিকতা বলে একটা কথা বহুল প্রচলিত। কিন্তু সহিষ্ণুতা আর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে মধ্যযুগের মানুষেরা যে আসলে কোনো কোনো সময় এখনকার চেয়ে ঢের ভালো ছিলেন, তার একটি ঘটনা উল্লেখ করা উচিত। এ ঘটনাটি বৃন্দাবন দাস ঠাকুরের ‘চৈতন্য ভাগবত’ গ্রন্থে পড়েছিলাম।

সেই সময় বাংলায় সুলতানদের ক্ষমতা দখলের পর থেকেই নিম্নবর্ণের হিন্দুরা গণহারে মুসলমান হতে থাকে। তারা এত দিন উপেক্ষিত ছিল নিজ ধর্মের ব্রাহ্মণদের কাছে। তখন সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের যুগ। গুটিকয় ব্রাহ্মণ ছাড়া হিন্দুধর্ম বিলীন হওয়ার উপক্রম। এ সময় বিপন্ন ধর্মকে রক্ষার জন্য এগিয়ে এলেন চৈতন্যদেব। তিনি বৈষ্ণবসাধনাকে নতুনভাবে হাজির করলেন। সেটি দৃশ্যত মানবিকতায় পরিপূর্ণ ছিল এবং রীতিমতো আন্দোলনে রূপ নিলো। ধর্মান্তর ঠেকিয়ে হিন্দুধর্মের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবিভর্ভূত হলেন শ্রী চৈতন্য। হিন্দুরা দলে দলে তার কাছে আসতে শুরু করে।

স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানেরা এটা মেনে নিতে পারেনি। এ খবর গেল হুসেন শাহের কানে। সুলতান চৈতন্যের সাথে দেখা করতে চাইলেন। সুলতান বললেন, আমি নিজেই তার সাখে দেখা করতে যাবো! শ্রী চৈতন্য তখন গৌড়ের কাছে গঙ্গা তীরের রামকেলি গ্রামে। তার সাথে সুলতানের মতবিনিময় শেষে সুলতান কোতোয়ালকে ডাকলেন। সবাই ভাবল, এখনই গর্দান নেয়ার আদেশ হবে। সুলতান তাকে আদেশ করলেন, এরপর থেকে কেউ যদি চৈতন্যের ধর্মপ্রচারে বাধা দেয়, তাহলে তার গর্দান নেবে।

এ তো গেল উদারতা, সহিষ্ণুতা বা গণতন্ত্রের বিষয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ব্যাপারে ভলতেয়ারকে স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি বলেছিলেন, ‘তোমার মতামতের সঙ্গে হয়তো একমত নাও হতে পারি। কিন্তু তোমার মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আমার জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করে দেবো।’ আর আমরা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বলে বলে যখন ভাসিয়ে দিচ্ছি আমাদের গণতন্ত্র, তখন ডিজিটাল আইন করে মত প্রকাশের স্বাধীনতা তথা সাংবাদিকতার ‘বারোটা বাজাচ্ছি’। এ অবস্থায় মনে হয়, আমরা কি স্বাধীনতাকে সীমিত আর গণতন্ত্রকে সীমাবদ্ধ করার প্রহসনে আটকে ফেলছি।

ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) বৈশ্বিক গণতন্ত্রের সূচক-২০১৭-তে বাংলাদেশের অবস্থান আট ধাপ পিছিয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের স্কোর ২০১৬ সালের তুলনায় কমেছে। ২০১৭ সালের সূচকে এ দেশের অবস্থান ৯২তম এবং স্কোর ১০-এর মধ্যে ৫.৪৩। অথচ ২০১৬ সালে অবস্থান ৮৪তম এবং স্কোর ছিল ৫.৭৩। এ গবেষণাটির ক্ষেত্রে পাঁচটি মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়ে থাকে। সেগুলো হলো নির্বাচনগুলো অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়া, সরকারে ভারসাম্য থাকা, জনগণকে রাজনীতিতে যুক্ত করা, জনগণ সরকারকে সমর্থন করে কি না এবং তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। আর এসব মানদণ্ডে আমরা কতটা তলানিতে আছি তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হতে হয় না।

কিছুদিন আগে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, বাংলাদেশে স্বাধীন গণমাধ্যমগুলো মারাত্মক চাপে আছে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা হচ্ছে বাধাগ্রস্ত। এ দিকে, ৫৭ ধারার পর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করেছে সরকার। অত্যন্ত বিস্ময়কর হলো, আমাদের বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮’ অনেক চিন্তাভাবনা করেই করা হয়েছে। অনুমোদনের আগে এ আইনটি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আগের আইসিটি অ্যাক্টটি বিএনপির সময়ে করা ছিল। যেখানে অনেক বিষয় অস্পষ্ট ছিল। নতুন আইনে বিষয়গুলো আরো স্পষ্ট করা হয়েছে। আবার আইনমন্ত্রী সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, ‘এ আইন নিয়ে আর কী বলব? কারণ আইনটি তো আমি করিনি। আইনটি চূড়ান্ত করেছে আইসিটি মন্ত্রণালয়।’ আমরা এসব শুনে হাসব না কাঁদব?

লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, সরকারের মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮’-এর ৩২ ধারায় বর্ণিত ‘গুপ্তচর’ শব্দ নিয়ে বিব্রত খোদ সরকারের নীতি-নির্ধারণী মহল। অনেকেই নিজেদের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনায় বিষয়কে ‘ডিজিটাল গুপ্তচর’ বৃত্তি নামে অভিহিত করেছেন। অথচ ১৯৪৮ সালে গৃহীত Universal Declaration of Human Rights এর আর্টিকেল ১৯-এ রয়েছে, Everyone has the right to freedom of opinion and expression; this right includes freedom to hold opinions without interference and to seek, receive and impart information and ideas through any media and regardless of frontiers.

এ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশকেও বাক এবং ব্যক্তির স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিতে হবে। অনুরূপভাবে, International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)-এর আর্টিকেল ১৯ নম্বরেও কথা বলার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে বলা হয়েছে : the right to hold opinions without interference. Everyone shall have the right to freedom of expression.

আমাদের সংবিধান ব্যক্তির মত প্রকাশের অধিকার এবং বাকস্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতা প্রসঙ্গে লেখা আছে, ‘Freedom of thought and conscience is guaranteed’ (চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হল)।

ইতিহাস আর সাম্প্রতিক ঘটনাবলি বিশ্লেষণে আমরা দেখেছি, জনগণের পক্ষ থেকে সমালোচনা থাকলে গণতন্ত্র হোঁচট খায় না। তার একটি উদাহরণ বর্তমান ট্রাম্পের শাসনামল। সাংবাদিক মাইকেল উলফ ৩৩৬ পৃষ্ঠার বই লিখেছেন। নাম ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি : ইনসাইড দ্য ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ’। নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার সাংবাদিক জন ক্যাসিডি বলেছেন, এই বইতে উলফ ট্রাম্পের যে ‘পোট্রেটটি’ এঁকেছেন, তা এককথায় ‘বিধ্বংসী’। বইতে উঠে এসেছে ট্রাম্প সম্পর্কে নানাজনের বক্তব্য। রাজস্বমন্ত্রী স্টিভ মিনুশিন ও সাবেক চিফ অব স্টাফ রেইন্স প্রিবাসের কথায়, ট্রাম্প একটা ‘মূর্খ’ (ইডিয়ট), অর্থনৈতিক উপদেষ্টা গ্যারিকনের ভাষায়, ‘তিনি বিষ্ঠার ন্যায় বুদ্ধু’ এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাকমাস্টারের কথায়, লোকটা আস্ত ‘আফিমখোর’ (ডোপ)। আর প্রেসিডেন্টের ‘মাথা পরীক্ষা করা’র কথা তো বলেছেন অনেকেই।

আমাদের গণতন্ত্রে সহিষ্ণুতার যে দশা, তাতে নিশ্চিত করেই বলা যায়- এ দেশে প্রকাশিত হলে এমন বই এবং বইয়ের লেখককে একসাথে নিষিদ্ধ করা হতো। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায়ই জানিয়েছেন, হোয়াইট হাউজে ওবামার নামে যত চিঠি আসে, তার অর্ধেকের বেশি চিঠিতে তাকে বলা হয় গর্দভ; অন্যান্য গালাগালি তো আছেই। কিন্তু এমন চিঠি পাঠানো কেউ ওবামার শাসনামলে গুম কিংবা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে কোনো খবর আমরা পাইনি!

ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারি বাজপেয়ীকে ব্যঙ্গ করে ১৯৯৮ সালে কবিতা লিখলেন ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার ছাত্র পীযূষ পাণ্ডে। বন্ধুরা কবিতাটা ক্যাম্পাসের সর্বত্র সেঁটে দিলেন। দিল্লির তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী, মদনলাল খুরানার তরফে মামলা করা হলো। পীযূষকে গ্রেফতার করে পেশ করা হলো খোদ প্রধানমন্ত্রীর দরবারে। অটলবিহারি সন্ধ্যাটা শুধু কবিতা নিয়ে আড্ডা দিয়ে কাটালেন। হাসতে হাসতে ফিরে এলেন বামপন্থী পীযূষ (আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৪ এপ্রিল ২০১২)।

আরেকটি ঘটনা। হিটলার ক্ষমতা গ্রহণের দিন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কথা বলার ‘দায়ে’ অজস্র মানুষকে অত্যাচার করেছেন। নাৎসি পার্টি লোকজনের বাড়ি আক্রমণ করত, ধরে নিয়ে যেত, মারধর করত এবং মেরে ফেলত। নাগরিকেরা হয়তো বলত, আমি জার্মানির নাগরিক, তাই ফুয়েরারের সমালোচনা করতেই পারি। নাৎসিরা জবাব দিত, ‘তুই কি ফুয়েরারের চেয়ে দেশকে বেশি ভালোবাসিস?’ মত প্রকাশের স্বাধীনতা হয় আন্দোলন বা অধিকার হিসেবে ‘স্বীকৃতি আদায়ের’ বিষয় যদি রাষ্ট্র হয়ে থাকে স্বৈরতান্ত্রিক।

ইংরেজ কবি মিল্টন সপ্তদশ শতকে ব্রিটিশ রাজার সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হন বিবেকের স্বাধীনতা ও চিন্তার স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য। ‘অ্যারিওপ্যাজিটিকা’ গ্রন্থে তার উচ্চারণ ছিল এ রকম; ‘দাও আমায়, জ্ঞানের স্বাধীনতা দাও, কথা কইবার স্বাধীনতা দাও এবং মুক্তভাবে বিতর্ক করার স্বাধীনতা দাও। সবার ওপরে, আমাকে দাও মুক্তি।’ মিল্টন স্বাধীনতা চেয়েছিলেন চার্চ ও রাষ্ট্র থেকে। কারণ ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ তখন এ দু’টি প্রতিষ্ঠান করত।

আঠারো শতকের শেষপর্যায়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় সংবাদপত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সে সময় সংবাদপত্র বিরাট মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় বা মতাদর্শগত বিতর্কের জন্য। গণমাধ্যম তাত্ত্বিক জুর্গেন হেবারমাস মুক্ত আলোচনার বিষয়ে প্রথমে উদাহরণ দিয়েছেন আঠারো শতকের public sphere-এ আলোচনাকে যেটা ছিল চার্চ ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। তার প্রতীতি, আঠার শতকে সংবাদপত্র ও সাময়িকী ‘জনপরিসর’-এর অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিল।

আব্রাহাম লিঙ্কনের বহুলব্যবহৃত সেই বক্তব্যে তিনি বলে গেছেন, ‘If you want to test a man’s character, give him power. এ পরীক্ষায় কত রাম যে রাবণ হয়ে উঠল তার কোনো ইয়ত্তা নেই! আমাদের পাশে নাফ নদীর ওপারেই বর্তমানে এমন নগ্ন উদাহরণ আছে। যে মানুষটি জীবনভর গণতন্ত্রের জন্য লড়াই ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন, সেই অং সান সু চি’ই ক্ষমতা হাতে নিয়ে হয়ে গেলেন অগণতান্ত্রিক।

আমাদের জনগণ চায় বুক ভরে শ্বাস নিতে। আমরা প্রশ্ন ফাঁসের রাজত্ব চাই না, গণতন্ত্র তলানিতে যাক- সেটাও চাই না; স্বাধীনভাবে ভোট দিতে চাই। আমরা মৌলিক নাগরিক ও মানবিক অধিকার চাই। জাতীয় জীবনে সব অসঙ্গতির কথা খোলামেলা বলে দিতে চাই। স্বাধীন সাংবাদিকতা না থাকলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকে না। তাতে কি সংবিধান লঙ্ঘন একটুও হয় না?

লেখক : তরুণ কবি ও গবেষক

    Print       Email

You might also like...

Nitu Chandra

ভাষা দিবসকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ভোজপুরি গান

Read More →