Loading...
You are here:  Home  >  ধর্ম-দর্শন  >  Current Article

হারিয়ে যাওয়া ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন কবিতা

35475307-09EC-49FC-8871-8E7390E3B894

ড. মোহাম্মদ হাননান : ধর্মীয় মূল্যবোধ সামনে রেখে বা ধর্মীয় কাহিনিগুলো সামনে রেখে অথবা ধর্মীয় উপদেশ কিংবা ধর্মীয় নীতিকথা অবলম্বন করে আগের জমানায় অনেক কবিতা লেখা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বাংলা কবিতার প্রাচীন ও মধ্যযুগ তো ধর্মীয় বিষয় অবলম্বন করেই লিখিত হয়েছে।

চর্যাপদ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলি ইত্যাদি ধর্মীয় আবহেই রচিত। আধুনিক যুগের শুরুটায়ও অনেক কবিতা লেখা হয়েছে ধর্মীয় অনুভূতিকে আশ্রয় করে। হঠাৎ করে কী হলো—একদল পণ্ডিতের আবির্ভাব হলো, যারা ধর্মটাকে ভয় পায়, তারা পাঠ্য বই থেকে এ ধারার কবিতাগুলো সব সরিয়ে ফেলল। পাশাপাশি ধর্মীয় অনুভূতির বাইরেও সব উপদেশমূলক ও নীতিকথার ছড়া-কবিতাও তারা বাতিল করে দিল।

অনেক সময় আমরা গুলিয়ে ফেলি ধর্ম ও পাকিস্তানকে। পাকিস্তান আমলের ধর্মের নামে অপশাসন হয়েছে—এটা সত্য। পাকিস্তানিরা ধর্মের অপব্যবহার করেছে—এটাও সত্য। তাই বলে পাকিস্তানিদের সঙ্গে ধর্মকেও বাদ দাও! একদল পাঠ্যপুস্তক বিশেষজ্ঞ এ অছিলায় সুযোগ পেয়ে গেছে। তারা যতখানি না পাকিস্তানবিরোধী, ভেতরে ভেতরে তার চেয়ে বেশি ধর্মবিরোধী।

ফলে ধর্মীয় অনুভূতিসম্পন্ন সব কবিতা তারা পাঠ্য বই থেকে সরিয়ে ফেলে। শিশু-কিশোররা যাতে কবিতাগুলো পড়তে না পারে, তার সব ব্যবস্থাই তারা করে।
কিন্তু আমরা দেখি, এসব কবিতা পাকিস্তান আমলে নয়, লিখিত হয়েছিল বেশির ভাগ খ্রিস্টীয় আমলে (১৭৫৭-১৯৪৭)। কিছু কবিতার নাম, কবির নামসহ আমি স্মরণ করছি—

১. কালীপ্রসন্ন ঘোষ (১৮৪৩-১৯১০) : কবিতার নাম : ‘সত্যের জয়’।

প্রথম দুই চরণ : ‘বিদ্যার লাগি বালক কাদের বাগদাদ যায় যবে,/বলিল জননী, ‘হে মোর পুত্র, সদা সৎ পথে রবে’। …

২. সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮২-১৯২২) : কবিতার নাম : ‘উত্তম ও অধম’।

শেষ চার চরণ : ‘কুকুরের কাজ কুকুর করেছে/কামড় দিয়েছে পায়,/তা বলে কুকুরে কামড়ানো কিরে/মানুষের শোভা পায়?’ [শেখ সাদীর কবিতা অবলম্বনে রচিত]।

৩. সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮২-১৯২২) : কবিতার নাম : ‘ফুল’।

কবিতার চরণ : ‘জোটে যদি মোটে একটি পয়সা/খাদ্য কিনিও ক্ষুধার লাগি,/দুটি যদি জোটে অর্ধেকে তার,/ফুল কিনে নিয়ো, হে অনুরাগী!’ [পবিত্র হাদিস অবলম্বনে]।

৪. কালিদাস রায় (১৮৮৯-১৯৭৫) : কবিতার নাম : ‘মাতৃভক্তি’।

প্রথম দুই চরণ : ‘‘বায়েজিদ বোস্তামী/শৈশব হ’তে জননীর সেবা করিতেন দিবাযামী। ’’…

৫. কালিদাস রায় (১৮৮৯-১৯৭৫) : কবিতার নাম : ‘অপূর্ব প্রতিশোধ’।

কয়েকটি চরণ : ‘পুত্র, তোমার হত্যাকারীকে পাইনিকো আজো ঢুঁড়ে—/আফসোস তাই জ্বলিছে সদাই তামাম কলিজা জুড়ে। … /বলিতে বলিতে রুমালে অশ্রু মুছিলেন ইউসুফ,/হেনকালে এক ঘটনা ঘটিল অদ্ভুত অপরূপ। ’

৬. শেখ হবিবর রহমান (১৮৯১-১৯৬২) : কবিতার নাম : ‘নবীর শিক্ষা’।

প্রথম দুই চরণ : ‘তিন দিন হতে খাইতে নাপাই, নাই কিছু মোর ঘরে,/দারা পরিবার বাড়িতে আমার উপোস করিয়া মরে। ’

৭. গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪) : কবিতার নাম : ‘প্রার্থনা’।

প্রথম কয়েকটি চরণ : ‘অনন্ত অসীম প্রেমময় তুমি/বিচার দিনের স্বামী। /যত গুণগান হে চির মহান/তোমারি অন্তর্যামী। [সুরা ফাতেহার ভাবানুবাদ]।

৮. কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) : কবিতার নাম : ‘নয়া যমানা’।

প্রথম কয়েক চরণ : ‘বাজিছে দামামা বাঁধরে আমামা/শির উঁচু করি মুসলমান। /দাওয়াত এসেছে নয়া যমানার/ভাঙ্গা কেল্লায় উড়ে নিশান। ’

৯. কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) : কবিতার নাম : ‘কাণ্ডারী’।

প্রথম দুই চরণ : ‘দুর্গম গিরি, কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার/লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশিথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার। ’

১০. আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪) : কবিতার নাম : ‘মানুষের সেবা’।

প্রথম দুুই চরণ : ‘হাশরের দিন বলিবেন খোদা, হে আদম সন্তান,/তুমি মোরে সেবা কর নাই যবে ছিনু রোগে অজ্ঞান’। …[পবিত্র হাদিস অবলম্বনে]।

১১. কাজী কাদের নেওয়াজ (১৯০৯-১৯৮৩) : কবিতার নাম : ‘শিক্ষকের মর্যাদা’।

প্রথম দুুই চরণ : ‘বাদশাহ আলমগীর/কুমারে তাঁহার পড়াইত এক মৌলভী দিল্লির’।

কবিতাগুলো ধর্মীয় মূল্যবোধকেই শুধু বহন করে না, তা শাশ্বত ও চিরন্তন মূল্যবোধকেও ধারণ করে। কালীপ্রসন্ন ঘোষ সেই উনিশ শতকে লিখেছিলেন বালক আবদুল কাদের জিলানির সততার ঘটনাটি নিয়ে, যেখানে মায়ের নির্দেশনায় ছিল—সর্বদা সৎপথে চলা ও মিথ্যা না-বলা। আর এটা পালনের মধ্য দিয়ে ডাকাতদলকে চমকে দিয়েছিলেন তিনি, যার ফলে ডাকাতরাও ডাকাতি ছেড়ে দিয়ে সৎপথে চলে আসে। আমাদের শিশু-কিশোররা এ কবিতা থেকে কি কিছু শিখতে পারত না? আমরা এমন আকর্ষণীয় একটি কবিতা থেকে বর্তমান প্রজন্মকে বঞ্চিত রেখেছি!

কালিদাস রায় তাঁর ‘মাতৃভক্তি’ কবিতাটি দিয়ে কী বার্তা দিয়েছিলেন তাঁর পরবর্তী প্রজন্মকে! একমাত্র মায়ের প্রতি ভালোবাসার কারণে দোয়া পেয়ে বায়েজিদ বোস্তামি সারা দুনিয়ার কত বড় এক জ্ঞানী মানুষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তা কি আমাদের শিশু-কিশোরদের জানা প্রয়োজন নেই? আজকের প্রজন্মে মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা-শ্রদ্ধা উঠে গেছে কেন, সে শিক্ষা কি আমাদের পাঠ্যপুস্তকে আছে?

কালিদাস রায়ের ‘অপূর্ব প্রতিশোধ’ও একটি শিক্ষণীয় কবিতা ছিল। সন্তানের হত্যাকারীকে কাছে পেয়েও কিভাবে ক্ষমা করেছিলেন ইউসুফ—এটা ছিল এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। বর্তমান প্রজন্মের কাছে শত্রুকে ক্ষমা করার এ অপূর্ব উদাহরণ আমরা সরিয়ে নিয়েছি।

সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘উত্তম ও অধম’ কবিতাটিও এখন পাঠ্য বইয়ে নেই। কুকুরের কাজ কুকুর করেছে, তা বলে মানুষের কাজ নয় কুকুরকে কামড়ানো। সমাজে যারা অমানুষ, তাদের মতো আমরাও যেন প্রতিশোধস্পৃহায় অমানবিক কাজ না করে বসি—এটাই ছিল তার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।

ফুল, মানুষের জীবনে সৌন্দর্য ও রুচির একটি চিরন্তন পরিচয়। ক্ষুধার সঙ্গে ফুলের মর্যাদা অর্ধেক-অর্ধেক ভাগাভাগি করে নিতে বলেছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। তথ্যটি কবির সংগ্রহে এসেছিল পবিত্র হাদিস থেকে, তাকেই তিনি কবিতায় রূপ দিয়েছিলেন—এ কথা তিনি লিখেছেন। অবশ্য আলেমসমাজ মনে করেন, এ কথাটি সরাসরি হাদিসে নেই, যদিও প্রকৃতি সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসে অসংখ্য বাণী আছে। যা-ই হোক, এ কবিতার মাধ্যমে আমাদের সৌন্দর্য-চেতনা আরো বিকশিত হতো কি না!

শেখ হবিবর রহমান লিখেছিলেন ‘নবীর শিক্ষা’ কবিতাটি। একটি লোক ভিক্ষা পেশা বেছে নিয়েছিল। নবী (সা.) তাকে আত্মনির্ভরশীল হতে শেখালেন, সে মেহনত করতে শিখল, ফলে তার ভাগ্য পরিবর্তন হয়ে গেল।

জাতির মধ্যে আজও যে ভিক্ষা করার প্রবণতা আছে, তা এ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকার কারণেই নয় কি?

নজরুল ‘নয়া যমানা’ কবিতাটি যখন লিখেছিলেন, তখন মুসলিমরা ছিল উপমহাদেশে পিছিয়ে পড়া জাতি। এ কবিতার একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও আছে। কিন্তু ‘বাজিছে দামামা বাঁধরে আমামা, শির উঁচু করি মুসলমান’—এই শব্দের জন্যই পাঠ্যপুস্তক থেকে উঠে গেল। তাঁর ‘কাণ্ডারী’ কবিতারও একই হাল। অথচ, ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? কাণ্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র—এত বড় শক্ত অসাম্প্রদায়িক বার্তা ছিল এ কবিতাটিতে। পাঠ্যপুস্তক থেকে তো উঠে গেছেই, কোথাও গাইতেও দেখবেন না আপনি এ কবিতাটি!

আজকে ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যকার সম্পর্কটি দেখুন। শিক্ষকরাও নৈতিকতা হারিয়েছেন, ছাত্রদের তাঁরা আর কী শেখাবেন! ছাত্ররা কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ যদি পড়তে পারত, তাহলে তারা তাদের কর্তব্য সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হতো—কতটুকু করা প্রয়োজন তাদের শিক্ষকের প্রতি।

শুধু নামাজ-রোজার মধ্যেই আল্লাহকে পাওয়া নয়, অসুস্থ আর্ত মানুষ, ক্ষুধার্ত মানুষ, পিপাসার্ত মানুষের সেবা করার মধ্যেও যে আল্লাহকে পাওয়া যায়, তা জানাতে আমাদের বড়ই শরম লাগে। কবি আবদুল কাদিরের ‘মানুষের সেবা’ নামক কবিতাটির প্রতিপাদ্য বিষয়টি তা-ই। তাই তো এসব কবিতা এখন আর চালু নেই। পাঠ্যপুস্তকে নেই, আলোচনায় নেই, উদ্ধৃতিতে নেই, কোথাও নেই। ‘নেই’ হয়ে যাওয়ার কারণ হয়তো আছে। কেননা এসব কবিতায় আছে আবদুল কাদের জিলানি (রহ.), বায়েজিদ বোস্তামির নাম অথবা কবিতার সূত্র এসেছে হাদিস থেকে কিংবা শেখ সাদি (রহ.) থেকে। সরাসরি নবী (সা.)-এর কথাও এসে গেছে। এ তো হতে দেওয়া যায় না! তাই আমাদের প্রজন্ম যেভাবে গড়ে ওঠে, উঠুক। ভাবখানা এমন, কোনোভাবেই ইসলাম, মুসলিম, কোরআন ও হাদিস থেকে নীতিবাদিতা ও মূল্যবোধ আনা যাবে না। অথচ বিষয়গুলো সাম্প্রদায়িক ছিল না। হলে কালীপ্রসন্ন ঘোষ, কালিদাস রায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মতো বড় কবিরা তাঁদের কবিতার বিষয়কে এখান থেকে গ্রহণ করতেন না।

এসব কবিতা পরিহার করে নতুন যে প্রজন্ম এখন বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিতে যাচ্ছে, এবং ভবিষ্যতে যে প্রজন্ম আসছে নেতৃত্বের আসনে, তাদের থেকে কতটুকু নৈতিকতা আমরা আশা করতে পারি—যেখানে মূল্যবোধ ও নৈতিকতা শেখানো থেকেই আমরা বিরত আছি! আমাদের হাল আমলের পাঠ্যপুস্তকের চেহারা দেখলে তা কি টের পাওয়া যায় না?

লেখক : কলাম লেখক ও গবেষক

    Print       Email

You might also like...

333970_15

দুই ওয়াক্ত নামাজ হয় কাজানের কুল শরীফ মসজিদে

Read More →