Loading...
You are here:  Home  >  কলাম  >  Current Article

গণতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রীদের পতন এবং ধর্মীয় শক্তির উত্থান

আবুল কাসেম ফজলুল হক |

F17104AE-D06F-4408-8C19-A960E0C68879

জীবপ্রযুক্তি ও তথ্য-প্রযুক্তির বিপ্লব এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর দেখা যাচ্ছে, মার্ক্সবাদ ও সমাজতন্ত্রের প্রতি শিক্ষিত লোকদের আগ্রহ শেষ হয়ে গেছে। অনেকে আশা করেছিলেন, কোল্ড ওয়ারের অবসানের পর গণতান্ত্রিক চিন্তা ও অনুশীলনের উন্নতি ঘটবে এবং গণতন্ত্রের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ দেখা দেবে।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে আশির দশক থেকেই উদারনীতি, অবাধ প্রতিযোগিতা, বন্ধুত্ববাদ, এনজিও, সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন (সিএসও) ইত্যাদির প্রতিষ্ঠা। এসবের মধ্যে গণতন্ত্রকে পরিণত করা হয়েছে শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনে। উন্নয়নের ধারণার মধ্যে ন্যায়-অন্যায়ের সমস্যা কোনো বিবেচনাই পায় না। বাংলাদেশে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন করার সামর্থ্যেরও পরিচয় দিতে পারছে না। স্বাভাবিকভাবেই লোকে কথিত এই গণতন্ত্রের প্রতিও আগ্রহহীন ও আস্থাহীন হয়ে পড়েছে। গণতন্ত্র দিয়ে কী হবে? এ রকম কথা বলার মতো লোকের অভাব দেখা যায় না। বাংলাদেশে নির্বাচন উপলক্ষে গণতন্ত্রের নামে হুজুগও এখন আর আগের মতো জমছে না। বাংলাদেশে সিএসও মহল অত্যন্ত সক্রিয় আছে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয় আলোচনায়। এ নিয়ে তাদের প্রচারকার্য ও নানা রকম তৎপরতার অভাব নেই। যতই প্রচার করা হোক, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের অবস্থা তৈরি হয়নি। নানাভাবে বাংলাদেশে চালানো হচ্ছে নিঃরাজনীতিকরণের কার্যক্রম। জুলুম-জবরদস্তি, শোষণ-পীড়ন-প্রতারণা, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নারী নির্যাতন, অসামাজিক কার্যকলাপ ইত্যাদি অবাধে চলছে। এ অবস্থার মধ্যে আশির দশকের শেষ দিক থেকেই চলছে ধর্মের পুনরুজ্জীবন। গণতান্ত্রিক বাস্তবতা কিংবা সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে না। নৈতিক পতনশীলতা চলছে।

ধর্মের পুনরুজ্জীবনের পেছনে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নানা আয়োজন কাজ করেছে। মৌলবাদবিরোধী আন্দোলন, নারীবাদী আন্দোলন, দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ইত্যাদি আশির দশক থেকেই বিবিসি রেডিওর মাধ্যমে অত্যন্ত তীব্রতার সঙ্গে পরিচালিত হয়েছে। ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আরো নানা উপায়ে উসকানিমূলক কার্যক্রম চালিয়ে ধর্মীয় শক্তিকে জাগিয়ে তুলেছে। ভারতে, তুরস্কে, মিসরে ও আরো কোনো কোনো রাষ্ট্রে ধর্মীয় শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে গেছে। ধর্মনিরপেক্ষতার সাংবিধানিক আচরণ বজায় রেখেই নির্বাচনের মাধ্যমে ভারতে ধর্মীয় শক্তি ক্ষমতায় এসেছে। বাংলাদেশের সংবিধানে এখন ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম—দুটিই আছে।

ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ধর্মীয় শক্তি নানাভাবে বাড়ছে। গণতন্ত্রী, সমাজতন্ত্রী ও মার্ক্সবাদীদের উন্নতি অনুসন্ধান করেও পাওয়া যায় না। কথিত গণতন্ত্রী-সমাজতন্ত্রী-ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা ক্রমে হেফাজতে ইসলাম, তাবলিগ জামাত, কওমি মাদরাসা, মসজিদ, দরগা, খানকার দিকে ঝুঁকছেন। গণতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রীদের মধ্যে নৈতিক জাগরণ কিংবা আদর্শগত বিশ্বস্ততা খুঁজে পাওয়া যায় না।

কিছু লোকে প্রবলভাবে ধর্মের অবসান চাইলেই ধর্ম অবসিত হবে না। সভ্যতার বিকাশে ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। প্রতিটি ধর্মই উন্মেষপর্বে ও প্রথম পর্যায়ে নিপীড়িত জনগণের জন্য কল্যাণকর ও প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করেছে। প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার পর প্রতিটি ধর্মই কায়েমি স্বার্থবাদীদের দ্বারা জনস্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের বেলায়ও একই ধরনের ঘটনা দেখা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ ধর্মের কিংবা আদর্শের অবলম্বন ছাড়া চলতে পারে না। আদর্শহীন বাস্তবতায় ধর্মকে শেষ করে দেওয়ার জন্য যতই চেষ্টা করা হচ্ছে, মানুষ ততই ধর্মের আশ্রয়ে চলে যাচ্ছে। গণতন্ত্রকে পুনর্গঠিত কিংবা নবায়িত করে সর্বজনীন গণতন্ত্রে রূপ দিলে এবং জনগণের জন্য প্রাণশক্তিসম্পন্ন আদর্শরূপে সামনে আনা হলে ঘটনাপ্রবাহ সম্মুখগতি লাভ করবে। সর্বজনীন গণতন্ত্রের জন্য নৈতিক জাগরণ, সেই সঙ্গে কায়েমি স্বার্থবাদীদের মোকাবেলায় অন্তহীন সংগ্রাম লাগবে।

মার্ক্সবাদীরা পুরনো বিশ্বাস নিয়ে চলছেন—যা পরিবর্তিত বাস্তবতায় একেবারেই খাপ খাচ্ছে না। পরাশ্রয়ী চিন্তায় আচ্ছন্ন মন নিয়ে যাঁরা সুবিধাবাদী হয়ে উঠেছেন, যাঁরা আগে মস্কোপন্থী কিংবা চীনপন্থী ছিলেন, তাঁদের অনেকে এখন বিশ্বায়নের কথা বলে বলে ওয়াশিংটনপন্থী হয়ে বিশ্বব্যাংকের পরিচালনায় চলছেন এবং সিএসও ও এনজিও করছেন। চিন্তায় ও কাজে লুকোচুরি আছে। বিশ্বায়নের নামে সাম্রাজ্যবাদের ভবিষ্যৎই এই ধারার ভবিষ্যৎ—এর স্বতন্ত্র কোনো ভবিষ্যৎ নেই।

বস্তুবাদ, দ্বন্দ্ববাদ, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ, শ্রেণি, শ্রেণিসংগ্রাম, বুর্জোয়া, প্রলেতারিয়েত, পুঁজিবাদ, মুক্তি, সর্বহারার একনায়কত্ব, বুর্জোয়া চরিত্র, প্রলেতারিয়ান চরিত্র, শ্রেণিচরিত্র, শ্রেণিচ্যুতি ইত্যাদি ধারণার আমূল পুনর্বিবেচনা ও সৃষ্টিশীল চিন্তা ছাড়া অগ্রগতির উপায় হবে না।

বিশ্বায়নের নামে সাম্রাজ্যবাদী ও কায়েমি স্বার্থবাদী মহল থেকে গণতন্ত্র ও আনুষঙ্গিক সব ব্যাপারে যেসব কথা বলা হচ্ছে এবং আদর্শহীনতার, সংস্কৃতিহীনতার, সভ্যতাহীনতার ও কথিত উন্নয়নের যে ধারণা অবলম্বন করে দুনিয়াব্যাপী কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, সেগুলোকে গভীরভাবে না বুঝে জনস্বার্থে কোনো অগ্রগতি সাধন করা যাবে না।

বর্তমানে জনস্বার্থে কাজ করছে এমন কোনো বর্ধিষ্ণু শক্তি দুনিয়ার কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি রাজনৈতিক শক্তি ও বৌদ্ধিক শক্তির (intellectual force) কথা বলছি। ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি (১৯৯১) পর্যন্ত সাধারণভাবে প্রায় সব ভূভাগে মানুষ ছিল পরিবর্তন-উন্মুখ। এখন অবস্থা পরিবর্তিত। এখন মানুষ পরিবর্তনবিমুখ। তখন ছিল প্রগতিশীল শক্তির কাল; এখন চলছে প্রগতিবিরোধী শক্তির কাল। প্রগতির ধারণা এখন সম্পূর্ণ বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে গেছে। এক শ্রেণির লোক শুধু ধর্মের বিরোধিতা করাকেই প্রগতি মনে করেছে। তারা সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা মদদপ্রাপ্ত হয়েছে। প্রগতির জন্য সর্বজনীন কল্যাণে, জাতীয় পর্যায়ে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, চিন্তার ও কর্মের স্বতন্ত্র কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে।

মানুষ জন্মগতভাবে যে জীবন ও জীবন পরিস্থিতি লাভ করে, তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে না। সে উন্নততর জীবন ও উন্নততর পরিবেশ আকাঙ্ক্ষা করে। বিশেষ বাস্তব অবস্থায় থেকে সে তার চিন্তাশক্তি ও কল্পনাশক্তি দিয়ে সবচেয়ে ভালো, সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে উন্নত অবস্থার কল্পচিত্র তৈরি করে। বহুজনের অভিপ্রেত এই কল্পিত বাস্তব সর্বজনীন কল্যাণকামী কোনো কোনো প্রতিভাবান ব্যক্তির প্রচেষ্টায় সমন্বিত রূপ নিয়ে হয়ে ওঠে আদর্শ। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি এমনিভাবে সৃষ্ট আদর্শ। বিশেষ বিশেষ ঐতিহাসিক বাস্তবতায় ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত চেষ্টার মধ্য দিয়ে আদর্শ রূপ নেয়। রাজনৈতিক আদর্শের পরিচয় প্রকাশ পায় রাষ্ট্রব্যবস্থার সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিধি-বিধানের, ভবিষ্যৎ চিন্তার কর্মসূচির ও কার্যপ্রণালীর মধ্য দিয়ে। মানুষের ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত উন্নতিশীল অস্তিত্বের অপরিহার্য অবলম্বন আদর্শ। বাস্তব ও আদর্শ বিকাশশীল। আদর্শ, কর্মসূচি, নেতৃত্ব ও ঐক্য অবলম্বন করে চললে সাধারণ মানুষ ও জনগণ শক্তিশালী হয়। আর এসবের অবলম্বন ছাড়া তারা দুর্বল ও অসহায় থাকে।

আদর্শহীন অবস্থায় জনসাধারণ অবাধে শোষিত, বঞ্চিত ও প্রতারিত হয়। আদর্শ অবলম্বন করে তারা নিজেদের থেকে নিজেদের জন্য নেতৃত্ব সৃষ্টি করে সংগ্রামের মাধ্যমে শোষণ, বঞ্চনা ও প্রতারণা থেকে পর্যায়ক্রমে মুক্তি পেতে পারে। আদর্শের প্রশ্নে কায়েমি-স্বার্থবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গি আর মুক্তিকামী জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি কখনো এক হয় না। কায়েমি-স্বার্থবাদীদের ছাড়া বাকি সবার জন্যই আদর্শ অপরিহার্য। জনগণ আদর্শের অবলম্বন চায়, আদর্শের নামে প্রতারণা চায় না। আদর্শ বাস্তবায়িত হয় পর্যায়ক্রমে আদর্শ-অভিমুখী পরিকল্পনা ও কর্মসূচি গ্রহণ করে।

চীনে জনজীবন কেমন? রাশিয়ায়? পূর্ব ইউরোপের সাবেক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে? ভিয়েতনামে? উত্তর কোরিয়ায়? কিউবায়? এসব রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা বিশ্ববাসীর জানা দরকার। পশ্চিমা প্রচারমাধ্যম যেটুকু জানায়, তা একদিকে অপর্যাপ্ত, অন্যদিকে তাদের দুরভিসন্ধিজাত। সর্বজনীন কল্যাণে যতটা সম্ভব প্রকৃত তথ্য সন্ধান করা দরকার।

মানবজাতির আদর্শগত সম্পর্কের সমাধান দরকার—এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিরা চিন্তা ও আলোচনা-সমালোচনা আরম্ভ করতে পারেন। কায়েমি স্বার্থবাদী সব শক্তি নতুন ধারার চিন্তা প্রকাশে ও তার বিকাশে বাধা সৃষ্টি করবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা দেখা দিলে এবং সংগ্রামের নতুন ধারা সৃষ্টি হলে অবস্থার পরিবর্তন সূচিত হবে।

ধর্মের পুনরুজ্জীবনের পেছনে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভূমিকা ভালো করে বুঝতে হবে। বিশ্বায়নের নামে সাম্রাজ্যবাদীরা যে কার্যক্রম চালাচ্ছে তা-ও বুঝতে হবে। বিশ্বায়ন তো সাম্রাজ্যবাদেরই উচ্চতর স্তর। উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের সমন্বিত রূপ আজকের এই বিশ্বায়ন।

মধ্যপ্রাচ্যের তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদের প্রতি সব সময়ই দেখা গেছে সাম্রাজ্যবাদীদের সীমাহীন লোভ। এই লোভ চরিতার্থ করার জন্য, কর্তৃত্বের প্রয়োজনে, তারা কখনো কখনো সোভিয়েত ইউনিয়নের এবং সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ইসলামের পুনরুজ্জীবন চাইত। ১৯৭৮ সালে আফগানিস্তানে সেনাবাহিনীর সহযোগে কমরেড তারাকির নেতৃত্বে সংঘটিত হয় কমিউনিস্ট বিপ্লব। তার পরপরই খোমেনির নেতৃত্বে ইরানে সংঘটিত হয় ইসলামী বিপ্লব। দুটি বিপ্লবই ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। তখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব খর্ব হয়।

আফগানিস্তানে কথিত এই কমিউনিস্ট বিপ্লবকে জনগণ মেনে নেয়নি। সে অবস্থায়ই সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে কমিউনিস্ট সরকারকে রক্ষা করার জন্য পর্যায়ক্রমে এক লাখেরও বেশি সৈন্য পাঠায়। মুসলিম জনগণের ওপর মার্ক্সবাদ চাপিয়ে দেওয়ার এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায়ই আফগানিস্তানে আত্মপ্রকাশ করে তালেবান ও আরো কয়েকটি জঙ্গিবাদী গ্রুপ (Armed Islamic Fundamentalist Groups). তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের মোকাবেলার প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র তালেবানকে সহায়তা করে এবং তালেবান যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নিয়ে জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডের দ্বারা ক্রমে সমগ্র আফগানিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেয়। তারপর দেখা যায় মোল্লা ওমরের নেতৃত্বে গঠিত তালেবান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী নীতির প্রতি অবাধ্য হয়ে উঠেছে। তখন যুক্তরাষ্ট্র কাবুলে মোল্লা ওমরের তালেবান সরকারকে এবং অবাধ্য তালেবানকে শায়েস্তা করার জন্য সামরিক অভিযান চালাতে থাকে। সে অবস্থায় চলমান ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্যে ২০০১ সালে কোনো অজ্ঞাত শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের গর্বের ধন টুইন টাওয়ার ধ্বংস করে। তারপর যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে একে একে আফগানিস্তানে, ইরাকে লিবিয়ায় ও সিরিয়ায় চালায় সামরিক আক্রমণ। তার প্রতিক্রিয়ায় আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ায় দেখা দেয় জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড—আত্মপ্রকাশ করে আল-কায়েদা, আইএস ইত্যাদি সংগঠন। ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার একদিকে আছে সাম্রাজ্যবাদীরা ও তাদের অনুসারীরা এবং অন্যদিকে আছে ইসলামপন্থীরা, যারা মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদী বলে অভিহিত হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদীরা এবং তাদের সহযোগীরা বিভিন্ন দেশে মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদীদের বিরুদ্ধে পুলিশ, মিলিটারি, আইন-আদালত, জেলখানা, ফাঁসিকাষ্ঠ ইত্যাদি নিয়ে ভীষণ সক্রিয় এবং আগ্রাসী সামরিক আক্রমণ ও গণহত্যায় লিপ্ত। সব কিছুর কেন্দ্রীয় পরিচালনায় দৃশ্যমান ও অদৃশ্যরূপে আছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রে তাদের অনুসারীরা। মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ন্যাটোর আগ্রাসী উপস্থিতি, সামরিক আক্রমণ, গণহত্যা ও জবরদখল বজায় রেখে বিশ্বশান্তি আশা করা হচ্ছে!

এসব দিক লক্ষ করে এবং আদর্শগত সংকটের কথা মনে রেখে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উপায় চিন্তা করতে হবে। যাঁদের রাজনৈতিক চিন্তা নিতান্তই নির্বাচনে সীমাবদ্ধ, তাঁদের চিন্তা বাস্তবসম্মত নয় এবং সে ধারার চিন্তা ও কাজ দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের দিকে যাত্রা ঘটছে না। নির্বাচন হোক অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং সব দলের অংশ গ্রহণে হোক—এটা আমরা কামনা করি। তবে বাস্তবতা লক্ষ করে শুধু এর মধ্যেই সব রাজনৈতিক চিন্তাকে সীমাবদ্ধ রাখাকে আমরা অকল্যাণকর মনে করি। আমরা মনে করি—গণতন্ত্রের আদর্শগত ধারণা জনগণের জন্য স্পষ্ট করতে হবে এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল গঠন করতে হবে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল গঠন ছাড়া সামাজিক আন্দোলন দিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র হবে না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল গঠনেই এখন কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিতে হবে।

লেখক : সৃজনপ্রয়াসী চিন্তাবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

    Print       Email

You might also like...

‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস দম ফুরালেই ঠুস’

Read More →